কোথায় আছেন, কী করছেন ড. ইউনূস
- আপডেট সময় ১১:৫৭:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের ব্যস্ততম দিনগুলো যেন হঠাৎ করেই থেমে গেছে। যে যমুনা ভবন কিছুদিন আগেও ছিল সিদ্ধান্ত, আলোচনা আর কূটনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্র, সেখানে এখন অনেকটাই নীরবতা। আর সেই নীরবতার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে একটি প্রশ্ন—এখন কোথায় আছেন সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, কী নিয়েই বা কাটছে তার সময়?
দায়িত্ব শেষ হলেও আপাতত তিনি অবস্থান করছেন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনাতেই। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি নয়, সাময়িক। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গুলশানে তার নিজস্ব বাসভবনে কিছু সংস্কার ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রস্তুতি চলায় তিনি কয়েকদিনের জন্য যমুনায় থাকছেন। কাজ শেষ হলেই তিনি সপরিবারে সেখানে ফিরে যাবেন। ধারণা করা হচ্ছে, খুব শিগগিরই এই স্থানান্তর সম্পন্ন হবে।
যমুনা থেকে বিদায়ের প্রস্তুতি
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর যমুনাকেই প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেখান থেকেই তিনি পরিচালনা করেছেন প্রশাসনিক কার্যক্রম। গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী বৈঠক, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, নির্বাচনসংক্রান্ত আলোচনা, বিদেশি প্রতিনিধি ও কূটনীতিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ—সবই হয়েছে এই ভবনকে ঘিরে।
দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর সরকারি বাসভবনে থাকার নিয়ম না থাকায় এখন আনুষ্ঠানিকভাবে সেটি ছাড়ার প্রস্তুতি চলছে। দায়িত্ব হস্তান্তরসংক্রান্ত কিছু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, নথিপত্র গুছিয়ে নেওয়া এবং ব্যক্তিগত জিনিসপত্র স্থানান্তরের কাজও চলছে বলে জানা গেছে।
বর্তমানে স্ত্রী ও কন্যাসহ যমুনায় অবস্থান করছেন তিনি। সরকারি নিরাপত্তা ও প্রটোকলের কাঠামো ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে, তবে একজন নোবেলজয়ী এবং সাবেক সরকারপ্রধান হিসেবে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় থাকবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর অধ্যাপক ইউনূস সরকারি বাসভবন যমুনাই থাকছেন কিনা- এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা জোনের এডিসি মীর আসাদুজ্জামান বলেন, অধ্যাপক ইউনূস যমুনায় সরকারি বাসভবনেই আছেন। তবে, অধ্যাপক ইউনূস এক সপ্তাহের মধ্যে সরকারি বাসভবন যমুনা ছেড়ে দেবেন বলে জানা গেছে।
আবার পুরোনো কর্মমুখর জীবনে
রাষ্ট্রীয় অধ্যায় শেষ হলেও থেমে নেই তার কর্মপরিকল্পনা। আগামী সপ্তাহ থেকেই তিনি তার প্রতিষ্ঠিত ইউনূস সেন্টারে নিয়মিত অফিস শুরু করবেন বলে জানা গেছে। যমুনায় অবস্থানকালেই তিনি ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কিছু কাজ সারছেন এবং ভবিষ্যৎ কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বিশেষ করে তার বহুল আলোচিত ‘থ্রি জিরো’ ধারণা—শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ—নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজ আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে। সামাজিক ব্যবসা, তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি, পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক মডেল—এসব বিষয়েই তিনি আবার পূর্ণমাত্রায় সক্রিয় হতে চান।
ঘনিষ্ঠ মহল জানায়, দায়িত্ব শেষ হলেও দেশেই থাকছেন তিনি। ব্যক্তিগত সময়ের পাশাপাশি বিভিন্ন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছেন। দীর্ঘ প্রশাসনিক ব্যস্ততার পর এটি তার জন্য এক ধরনের ‘ট্রানজিশন পিরিয়ড’—রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ও বৈশ্বিক কার্যক্রমে ফিরে যাওয়ার সময়।
জাপান সফর
মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে জাপান সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে অধ্যাপক ইউনূসের। জাপানের সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে পাঁচ দিনব্যাপী একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন তিনি। সেখানে বক্তৃতা দেবেন, বিভিন্ন নীতি-আলোচনায় অংশ নেবেন এবং সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে বৈঠক করবেন।
এই সফরটি অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বে থাকাকালেই নির্ধারিত হয়েছিল। দায়িত্ব-পরবর্তী এটিই হবে তার প্রথম বিদেশ সফর। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অনুষ্ঠান শেষে তিনি দেশে ফিরে আসবেন এবং এখান থেকেই তার কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে একাধিক কনফারেন্স ও আন্তর্জাতিক ফোরামে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ রয়েছে তার কাছে। তবে আপাতত জাপান সফর ছাড়া অন্য কোনো সফর চূড়ান্ত হয়নি।
রাষ্ট্রীয় অধ্যায় শেষে নতুন বাস্তবতা
২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেন অধ্যাপক ইউনূস। ক্ষুদ্রঋণ আন্দোলন ও সামাজিক ব্যবসার ধারণা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। রাজনৈতিক অস্থিরতার এক পর্যায়ে দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করে তিনি যুক্ত হন সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালনায়।
এখন সেই অধ্যায় শেষ। কিন্তু জন-আলোচনা থেকে তিনি সরে যাননি, বরং নতুন এক পর্বের সূচনা করছেন—যেখানে থাকবে সামাজিক উদ্যোগ, বৈশ্বিক সহযোগিতা এবং তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে ভবিষ্যৎ ভাবনা।
যমুনার কক্ষগুলোতে আর বসছে না প্রশাসনিক বৈঠক, কিন্তু থেমে নেই অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের পথচলা। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের পর্দা নামলেও নতুন অধ্যায়ের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় কাটছে তার।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
















