ড. শহীদ উদ্দিন আহমেদ
খালেদা জিয়াকে যেমন দেখেছি
- আপডেট সময় ০৬:১৮:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
লক্ষ কোটি জনতাকে কাঁদিয়ে অসংখ্য ভক্তকে শোক সাগরে ভাসিয়ে চিরতরে চলে গেলেন আমাদের অতি প্রিয় নেত্রী ম্যাডাম খালেদা জিয়া। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে লন্ডন গেলাম আমার প্রিয় নেত্রী অসুস্থ ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে দেখতে। লন্ডন পৌঁছে ম্যাডামের ব্যক্তিগত চিকিৎসক প্রফেসর ড. জাহিদকে ফোন দিলাম এবং তার কাছ থেকে ম্যাডামের শারীরিক অবস্থার খবরাখবর জানতে চাইলাম। এরপর তাকে বললাম আমি অসুস্থ ম্যাডামকে দেখতে যেতে চাই। উত্তরে ড. জাহিদ বললেন যে ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করা খুবই রেস্ট্রিক্টেড। তখন তাকে বললাম আমি তাকে দেখতে না পারলেও অন্তত লন্ডন ক্লিনিকে গিয়ে রোগমুক্তি কামনায় গেটওয়েল কার্ড দিয়ে আসতে চাই। তিনি এ প্রস্তাবে সাড়া দিলেন এবং যেতে বললেন।
সেদিন ছিল ২০২৪ ২৩ জানুয়ারি। ছোট ভাই লন্ডনে বসবাসকারী অবসরপ্রাপ্ত বিএসসির জিএম ক্যাপ্টেন মইন, আমি এবং আমার সহধর্মিণী খোদেজা বেগম চুনিকে নিয়ে লন্ডন ক্লিনিকে পৌঁছাই। পৌঁছাতে চ্যানেল আইয়ের টিভি সাংবাদিকের সঙ্গে দেখা এবং তাকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার পর তিনি আমাদের হাসপাতালের রিসিপশনে নিয়ে যান। সেখানে ঢুকতেই ড. জাহিদের সঙ্গে দেখা এবং ম্যাডামের জন্য রোগমুক্তি কামনায় আমাদের পক্ষ থেকে তাকে একটি গেটওয়েল কার্ড ও ফুল ম্যাডামের নিকট পৌঁছে দেওয়ার জন্য ড. জাহিদের হাতে দিলাম। এগুলো নিয়ে ড. জাহিদ গিয়ে ম্যাডামকে আমার নাম বলার পর ম্যাডাম এ অসুস্থ শরীরেও আমাকে চিনতে পেরেছেন এবং আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে যেতে ড. জাহিদকে অনুমতি দিলেন। আমরা ড. জাহিদ ফিরে এলে তার থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু ড. জাহিদ তড়িঘড়ি করে ফিরে এসে আমাদের ম্যাডামের কক্ষে নিয়ে গেলেন। ম্যাডাম জানতে চাইলেন, আমরা কেমন আছি? তাঁর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের এক ফাঁকে আমার স্ত্রী বললেন, ‘ম্যাডাম আপনাকে যে এত কষ্ট দিল সে এখন কোথায়?’ আমরা তার উত্তর শুনে স্তম্ভিত হলাম- তিনি একবারেও তাঁর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একটি কথাও মন্দ বললেন না। শুধু বললেন, ‘আল্লাহ দেখবেন’।
মনে খুবই কষ্ট পাচ্ছি তাঁর মহাপ্রয়াণে। বেশি কষ্ট পাচ্ছি এটা ভেবে যে, তাঁর সঙ্গে আমার অনেকদিন দেখা হয়নি নিজেও দেশে ছিলাম না। কিন্তু এতদিন পরও নানা রোগে জর্জরিত অবস্থায়ও তিনি আমাকে চিনতে পেরেছেন এবং তার সঙ্গে দেখা করতে অনুমতি দিয়েছেন- এটা আমার প্রতি তার একটা স্ন্নেহ। এ স্ন্নেহ আমি কোথায় রাখব। আমার মা মারা যাওয়ার পর যেরূপ কষ্ট পেয়েছিলাম, সেরূপ কষ্টই আমি আজ পাচ্ছি। এ অনুভূতি একমাত্র আল্লাহ-এর তরফ থেকেই পাওয়া যায়। আল্লাহ ম্যাডামকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন- এ কামনাই শুধু করছি। একজন নির্ভীক নেত্রী খালেদা জিয়া। তাঁর অনেক সাহসী কর্মকাণ্ডের উদাহরণ দেওয়ার মতো রয়েছে। তন্মধ্যে একটি ঘটনার সাক্ষী আর, যা এখানে বলতে চাই।
নব্বই-এর গণঅভ্যুত্থান পূর্ববর্তী সময়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় একদিন সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি দেওয়া হয়েছিল। তাঁর আহ্বানে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ওই ঘেরাও কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেই। উল্লেখ্য, সে সময় এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা সব দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বেশি যোগাযোগ রেখে চলত। শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেক আমরা মিছিল নিয়ে সচিবালয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলাম। শিক্ষক সমিতির মিছিলটি সচিবালয়ের কাছাকাছি পৌঁছাতেই শুরু হলো টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ। ফলে আমাদের মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। শুনলাম, ম্যাডাম খালেদা জিয়া জনতার মিছিলের নেতৃত্বে সামনের কাতারে থেকে টিয়ার গ্যাস সেলের আঘাত পেয়ে আহত হয়েছেন। ঝুঁকি নিয়ে ম্যাডামকে দেখতে একটু সামনের দিকে এগোতেই দেখি, ম্যাডাম জনগণের মনের সাহস যাতে ভঙ্গ না হয় সেজন্য নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন। এই অতি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়ও তার মনোবল এবং দৃঢ়তা দেখে অভিভূত হই। প্রশাসনে থেকে দলমত নির্বিশেষে প্রতিষ্ঠানের আইন অনুসারে দায়িত্ব পালন করার ব্যাপারে তিনি ছিলেন অতি সজাগ।
আমার খেয়াল আছে বিশেষ মহলের বাধা এড়িয়ে তিনি যখন আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেন, আমি উক্ত পদে যোগদান করে তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যাই। তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমি জিজ্ঞেস করি, আমার প্রতি তাঁর কোনো উপদেশ আছে কি না। এর উত্তরে তিনি আমাকে বলেন, ‘আপনাকে যোগ্য বিবেচনা করেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুসরণ করে ন্যায়নীতির সঙ্গে দায়িত্ব নির্বাহ করবেন।’
তাঁর ন্যায়নীতির প্রতি নিষ্ঠা দেখে অভিভূত হয়ে গেলাম। এত বড় একজন আদর্শবান ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অশেষ রহমতের কারণে আল্লাহর ইচ্ছায় কোটি লোকের আকুতিতে এত বড় জনসমাবেশে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হলো তার। আমি তাঁর নিকট কৃতজ্ঞ। কারণ আমি বারবার তাঁর আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। আমি যখন কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বে, তখন প্রো-ভিসির পদ শূন্য হয়। আমি এই পদের জন্য প্রার্থী ছিলাম না। বরং এক বন্ধু সহকর্মীর প্রতি সমর্থন ছিল। কিন্তু তার সঙ্গে আর একজন অধ্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন। যতটুকু বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছি দুজনের তীব্র তদ্বিরে ম্যাডাম বিরক্ত হয়ে তাদের কাউকে নিয়োগ না দিয়ে তাঁর দপ্তরকে নির্দেশ দেন আমাকে নিয়োগ দিতে। আমি নিয়োগ দেওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে খবর জেনে অতি আশ্চর্য হলাম। লজ্জায় পড়ে গেলাম আমার সহকর্মী বন্ধু আমাকে ভুল বুঝতে পারেন। কিন্তু ম্যাডামের আশীর্বাদ উপেক্ষা করে না বলার মতো অশোভন কাজ করাও আমার জন্য গর্বিত আচরণ হবে বিধায় গ্রেইসফুলি পদটি গ্রহণ করলাম। আমার অনুভূতি হলো যে, আমি ম্যাডাম খালেদা জিয়ার আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। প্রো-ভিসি পদে থাকার সময়ে ম্যাডাম একবার আমাকে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে খবর পাঠান। যাওয়ার পর তিনি আমার সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক নিয়োগে কোনো বৈষম্য করা হয় কি না জানতে চান। এতে একটু বিব্রত বোধ করলাম। বুঝতে পারলাম তার কাছে খবর আছে। কারণ আমি দু’একবার নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি হিসেবে এ প্রবণতার সম্মুখীন হয়েছি। যদিও এ ধরনের প্রবণতার প্রশ্রয় আমি কখনো দেইনি। এ প্রবণতার পিছে তাদের যুক্তি ছিল যে, মেয়েদের বিভাগের সব কাজে সব সময়ে পাওয়া যায় না। কারণ পারিবারিক কারণে ও রাত-বিরাতে জরুরি কাজে মেয়েদের পাওয়া যায় না। ম্যাডাম এ কথা শুনে সন্তুষ্ট হতে পারেননি, তিনি বললেন, ‘এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না। এ ধরনের প্রবণতাকে প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হবে না’। খালেদা জিয়াই প্রথম নারী শিক্ষার উন্নয়নে মেয়েদের হায়ার সেকেন্ডারি লেভেল পর্যন্ত বিনা বেতনে শিক্ষাদানের প্রথা চালু করেন।
খালেদা জিয়া উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রেও দেশে নারীদের প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়ার অগ্রদূত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনিই প্রথম নারী প্রো-ভিসি নিয়োগ দেন। একজন নারীকে তিনিই প্রথম সরকারি কর্ম-কমিশনের মতো এত উঁচু স্তরের প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেন। বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে লিখে শেষ করা যাবে না। নানা কাজে তাঁর সংস্পর্শে এসে অনেক চমৎকার স্মৃতি আমি ও আমরা বহন করছি। আল্লাহ যদি মেহেরবানী করেন, ভবিষ্যতে আরও অনেক স্মৃতিচারণ করার আশা রাখি।
লেখক : অধ্যাপক, সাবেক প্রো-উপাচার্য ও উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়






















