বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথায় তীব্র যানজট। এর মধ্যেই প্রবেশ করছে আন্তঃথানা যাত্রীবাহী বাস। ছবি
চার কারণে বগুড়া শহরে যানজট, পথচারীদের দুর্ভোগ
- আপডেট সময় ০২:২২:১৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬
ঈদ সামনে রেখে কেনাকাটা ও মানুষের যাতায়াত বাড়ায় বগুড়া শহরের প্রধান সড়কগুলো এখন প্রায় সারাদিনই যানজটে থমকে থাকছে। শুধু যানবাহনের চাপ নয়, এই অচলাবস্থার পেছনে রয়েছে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও।
শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথায় অঘোষিত বাসস্ট্যান্ড, ফুটপাতজুড়ে শত শত অস্থায়ী দোকান, যত্রতত্র সিএনজি ও অটোরিকশার স্ট্যান্ড এবং দিনের বেলা শহরে কুরিয়ার ট্রাকের প্রবেশ– এই চার কারণে শহরের যানজট দিন দিন বাড়ছে। এতে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন শহরবাসী।
সাতমাথা মোড়ে অবৈধ বাসস্ট্যান্ড
বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা মোড়ে সাতটি সড়ক এসে মিলেছে। নিয়ম অনুযায়ী এটি হওয়া উচিত ছিল সবচেয়ে নিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক পয়েন্ট। কিন্তু বাস্তবে এটি এখন শহরের সবচেয়ে বড় বিশৃঙ্খলার কেন্দ্র। সকাল থেকে শুরু করে দিনভর এখানে যানবাহনের দীর্ঘ সারি জমে থাকে। এর মাঝেই ঢুকে পড়ে গেটলক সার্ভিস নামে পরিচিত আন্তঃথানা রুটের বাস। মোড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই সাতমাথা মোড়কে অবৈধভাবে স্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। একজন পরিবহন মালিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাতমাথায় গাড়ি দাঁড়ায় সবার চোখের সামনে। প্রশাসন চাইলে একদিনেই বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু বন্ধ হয় না কেন সেটি বুঝে নিতে হবে।
ফুটপাত দখল ও অস্থায়ী দোকানের বিস্তার
শহরের বিভিন্ন সড়কে ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো এখন যানজটের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাতমাথার ট্রাফিক ফাঁড়ির দেয়াল ভেঙে অনুমোদন ছাড়াই গড়ে তোলা হয়েছে একটি ফুচকা মার্কেট। সেখানে সারাদিন যানজট লেগে থাকলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। থানা রোড, কাঁঠালতলা, স্টেশন রোড ও জলেশ্বরীতলা এলাকায় দেখা গেছে স্থায়ী দোকান মালিকরা নিজেদের দোকানের সামনে ফুটপাতে টেবিল বসিয়ে পণ্য সাজান। আবার অনেকেই ফুটপাতের অংশ ভাড়া দিয়ে অস্থায়ী দোকান বসতে দেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঈদকে কেন্দ্র করে সাতমাথা ও আশপাশ এলাকায় প্রায় ৯৯০টি দোকান বসেছে। এর মধ্যে ফলের দোকান ২৫৪টি, ফুচকার দোকান ৩৫টি, ভ্যানে কাপড় বিক্রেতা ৬৩৭ জন, ফাস্টফুড দোকান ২৯টি এবং চায়ের দোকান রয়েছে ৩৫টি। এসব দোকানের কারণে ফুটপাত দিয়ে হাঁটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে পথচারীদের নেমে যেতে হয় মূল সড়কে। জেলার সারিয়াকান্দি থেকে কেনাকাটা করতে আসা স্কুল শিক্ষক সাগর হোসেন বলেন, ফুটপাত দিয়ে হাঁটার কোনো সুযোগ নেই। রাস্তা দিয়েই হাঁটতে হয়।
সিএনজি ও অটোরিকশার অবৈধ স্ট্যান্ড
শহরের বিভিন্ন সড়কে গড়ে ওঠা সিএনজি ও অটোরিকশার অস্থায়ী স্ট্যান্ডও যানজটের অন্যতম বড় কারণ। গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সড়কের পাশে অনুমোদনহীন এসব স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। সাতমাথা, থানা রোড, দত্তবাড়ি, স্টেশন রোড, শেরপুর রোড ও চেলোপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে সড়কের পাশে সারি করে দাঁড়িয়ে থাকে সিএনজি ও অটোরিকশা। অনেক সময় যাত্রী ওঠানামার জন্য গাড়িগুলো রাস্তার মাঝখানেই থেমে থাকে। এতে স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং যানজট তৈরি হয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, সাতমাথা ও আশপাশের এলাকায় সারাদিন সিএনজি ও অটোরিকশার জটলা লেগে থাকে। যাত্রী পাওয়ার আশায় চালকরা রাস্তার পাশে সারি করে দাঁড়িয়ে থাকেন। এতে রাস্তার কার্যকর (চলাচল উপযোগী) প্রস্থ কমে যায় এবং অল্প সময়েই দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়।
দিনের বেলা কুরিয়ার ট্রাকের প্রবেশ
নিয়ম অনুযায়ী ব্যস্ত সময়ে শহরে ভারী যানবাহন প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শহরের ভেতরে বড় ট্রাক ঢোকার অনুমতি নেই। কিন্তু বাস্তবে দিনের বেলাতেই শহরে কুরিয়ার সার্ভিসের ট্রাক ঢুকে বিভিন্ন স্থানে মালামাল ওঠানামা করছে। এতে প্রধান সড়কগুলো অনেক সময় আংশিক বন্ধ হয়ে যায় এবং যানজট সৃষ্টি করে।
শহরের সাতমাথা, থানা রোড, সাতানি মসজিদ রোড, সেউজগাড়ি, স্টেশন রোডসহ আশপাশের এলাকায় প্রতিদিন দিনের বেলা বিভিন্ন কুরিয়ার কোম্পানির ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকে। ব্যস্ত সময়েই এসব ট্রাক সড়কের পাশে দীর্ঘ সময় জুড়ে মালপত্র লোড-আনলোড করে। শুধু কুরিয়ার ট্রাকই নয়, শহরের সাতমাথা ও আশপাশ এলাকায় বিভিন্ন বাস কোম্পানির টিকিট কাউন্টার ও অস্থায়ী বাসস্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। এসব বাস কোম্পানি নিয়ম মেনে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা না করায় যানজট সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিবহন শ্রমিক বলেন, গাড়ি কোথায় দাঁড়াবে, কোথা থেকে যাত্রী তুলবে, সবকিছুর একটা হিসাব আছে। আইন না মানলেই সমস্যা তৈরি হয়।
স্থায়ী সমাধানে উদ্যোগ নেই প্রশাসনের মাঝেমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ফুটপাতের দোকান সরানো হয়। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই আবার সেই জায়গায় দোকান বসে যায়। ফলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। এক সপ্তাহ আগে জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান নিজে অভিযান করে পুলিশ প্লাজার সামনে একটি অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করেন। কিন্তু তিনি চলে যাবার পরপরই সেই দোকানটি আবার চালু হয়। গত এক মাসে এই ধরনের সাতটি অভিযানের পরেও ফুটপাতমুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
ট্রাফিক পরিদর্শক (প্রশাসন) সালেকুজ্জামান বলেন, ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত অভিযান চালানো হয়। তবে অভিযান শেষ হলেই দোকানিরা আবার বসে পড়ে।
সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযানের (সুপ্র) জেলা সম্পাদক কে জি এম ফারুক বলেন, ট্রাফিক পুলিশের চোখের সামনে সাতমাথা মোড় অবৈধ স্ট্যান্ডে পরিণত হলে যানজট কমবে কীভাবে। তাঁর মতে, কারা এসবের সঙ্গে জড়িত তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা না নিলে শহরের যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
সূত্র: #সমকাল












