জলপাইগুড়ির পুতুল থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া
- আপডেট সময় ১০:২৮:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬
ইতিহাস কখনো কখনো মানুষকে এমন এক যাত্রাপথে নিয়ে যায়, যা রূপকথাকেও হার মানায়।
জলপাইগুড়ির এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া একটি কন্যাশিশু যার শৈশব কেটেছে সীমান্তঘেঁষা নিস্তরঙ্গ জনপদের আলো-ছায়ায় একদিন হয়ে উঠবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, তা কল্পনাও করেনি কেউ। সেই কন্যাই বেগম খালেদা জিয়া; উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক দৃঢ় ও প্রভাবশালী নারীর নাম।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি শহরে খালেদা জিয়ার জন্ম। তৎকালীন সামাজিক বাস্তবতায় মেয়েদের শিক্ষা ও নেতৃত্বের সুযোগ ছিল সীমিত। কিন্তু পরিবার থেকেই তিনি পেয়েছিলেন আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসের বীজ। ভারত দেশভাগের পর তাঁর পরিবার পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। এই ভৌগোলিক পরিবর্তন শুধু ঠিকানা বদল নয়; এটি ছিল তাঁর জীবনের মোড় ঘোরানোর প্রথম ধাপ।
ঢাকায় শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করে খালেদা জিয়া গৃহিণী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন দীর্ঘদিন। তাঁর জীবন রাজনীতির আলোয় আসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তিনি কেবল ‘কারও স্ত্রী’ হিসেবে থেমে থাকেননি। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক শূন্যতা সৃষ্টি হয়। সেই কঠিন সময়ে রাজনীতির ভার নেন খালেদা জিয়া নিঃশব্দ গৃহিণী থেকে তিনি হয়ে ওঠেন রাজপথের সাহসী নেত্রী।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। কারাবরণ, নির্যাতন ও রাজনৈতিক চাপের মুখেও তিনি আপস করেননি। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসনের পতনের পর ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এর মধ্য দিয়ে তিনি শুধু বাংলাদেশেরই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী নারী নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর শাসনামলে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সংসদীয় ব্যবস্থা কার্যকর করা, শিক্ষা ও অবকাঠামো খাতে অগ্রগতির উদ্যোগ নেওয়া হয়। তিনি তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন যা নিজেই এক রাজনৈতিক মাইলফলক।
খালেদা জিয়ার জীবন কেবল ক্ষমতার গল্প নয়; এটি সংগ্রাম, ধৈর্য ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকার কাহিনি। জলপাইগুড়ির এক নিভৃত পাড়া থেকে বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছানো তাঁর যাত্রা প্রমাণ করে ইতিহাসে স্থান করে নিতে জন্মস্থান নয়, প্রয়োজন দৃঢ়তা ও নেতৃত্বের সাহস।

আজ তিনি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে অন্তরালে। তবুও বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। তাঁর জীবনগাথা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শেখায় একজন নারী, যিনি কোনোদিন রাজনীতি করার স্বপ্ন দেখেননি, তিনিই হয়ে উঠতে পারেন একটি জাতির নেতৃত্বের প্রতীক।
জ্যোতিষ সমাদ্দার বাবু, সাংবাদিক ও সংগঠক























