ভুয়া অ্যাপ ও জুয়ার এসএমএসে নাস্তানাবুদ গ্রাহক, দুর্বল ডিজিটাল কাঠামোয় বাড়ছে আর্থিক ঝুঁকি
- আপডেট সময় ০১:০৩:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬
ভুয়া অ্যাপ ও অনলাইন জুয়ার খুদে বার্তায় প্রতিদিনই সয়লাব হচ্ছে মোবাইল অপারেটরদের নম্বর। একবার এই ফাঁদে পা দিলেই সর্বস্ব হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে সাধারণ মানুষের জন্য। গ্রাহক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে ব্যাংকিং ও টেলিকম খাতের দুর্বল ও অপরিকল্পিত ডিজিটাল কাঠামো। অভিযোগ উঠছে, এই দুর্বলতার সুযোগে অপরাধ বাড়লেও ব্যাংক ও অপারেটরদের অসহযোগিতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
একটি ব্যাগে প্রায় ৬০ হাজার দেশীয় মোবাইল সিম—যার যেকোনোটি হতে পারে আপনার বা আমার নামেই নিবন্ধিত। এসব সিম ব্যবহার করা হচ্ছে অনলাইন জালিয়াতি ও জুয়ার অ্যাপে। এমনই এক প্রতারণার শিকার হয়েছেন মঞ্জুর হোসেন (ছদ্মনাম)।
ভুক্তভোগী মঞ্জুর হোসেনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসরণ করা বিভিন্ন স্টকসংক্রান্ত পেইজের সূত্র ধরে ধাপে ধাপে তার কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে প্রায় ১৮ লাখ টাকা। স্টক এক্সচেঞ্জের আদলে তৈরি করা হুবহু অ্যাপ ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে ফাঁদ পাতে প্রযুক্তি দুর্বৃত্তরা। অর্থের পাশাপাশি বিদেশে পাচার হয়েছে ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য।
তথ্য অনুযায়ী, “আপনি ৫ লাখ টাকা জিতেছেন” বা “১০ লাখ টাকা জিতেছেন”—এমন লোভনীয় নোটিফিকেশন এখন নিয়মিতই অনেকের মোবাইলে আসে। কিন্তু একবার এসব বার্তায় সাড়া দিলে শেষ পর্যন্ত সর্বস্ব হারানো ছাড়া উপায় থাকে না।
সম্প্রতি এক ব্যবসায়ীর জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য কম্প্রোমাইজ হওয়ার পর তার মোবাইল ফোনে থাকা সব ধরনের ব্যবসায়িক ও ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট, এমনকি ডাটাবেজও হ্যাক হয়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, ব্যাংক ও মোবাইল অপারেটরদের গড়িমসি ও তথ্য দিতে অনীহা এসব অপরাধকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে। ফলে জবাবদিহিতার আওতায় এই প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আনতে হবে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, “এখন পর্যন্ত কোনো এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে সাইবার অপরাধ ঘটলে অনেক প্রতিষ্ঠান পুলিশকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে চায় না। কাস্টমারের ডাটা প্রোটেকশনের অজুহাতে অজান্তেই অনেক সময় অপরাধীরা সুরক্ষা পেয়ে যায়।”
প্রযুক্তিগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বাড়ছে ‘কল স্পুফিং’—যার মাধ্যমে যেকোনো নম্বর ক্লোন করে নজরদারি বা ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে। প্রযুক্তিবিদ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, আর্থিক খাতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্বল ডিজিটাল অবকাঠামো। ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তা ঘাটতি এবং অপারেটরদের অনীহাই সাধারণ মানুষকে কল স্পুফিংয়ের শিকার বানাচ্ছে।
ডিএমপির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার সৈয়দ হারুণ অর রশীদ বলেন, “অনলাইন প্রতারণার মূল উৎস কিন্তু এই সিমকার্ডগুলো। বিষয়টি ছোট করে দেখার সুযোগ নেই, কারণ এগুলো রেজিস্টার্ড সিম।”
ডিজিটাল আর্থিক অপরাধ বাড়ছে—এ কথা স্বীকার করে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও নিরাপত্তা যাচাই করেই ডিজিটাল ব্যাংকিং, এমএফএস ও অপারেটরদের লাইসেন্স দেওয়া হয়। ফলে নিরাপত্তার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে মোবাইল ব্যাংকিং ও ব্যাংকগুলোর প্রতি স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।”
তবে একই সঙ্গে গ্রাহকদেরও সর্বোচ্চ সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
















