প্রবাসে দ্বিতীয় স্বামী, দেশে তালাকপ্রাপ্ত স্বামীর সঙ্গে সংসার
- আপডেট সময় ১১:২৮:০২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
বগুড়ার সান্তাহারের পাশ্ববর্তী এক নারীর বিরুদ্ধে কাগজে-কলমে দ্বিতীয় স্বামী থাকা সত্ত্বেও তালাকপ্রাপ্ত প্রথম স্বামীর সাথে দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে বসবাসের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
বিবাহ রেজিস্ট্রি সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে ওই নারী তার প্রথম স্বামী সান্টু রহমানকে তালাক দেন। এবং একই বছরের ১৪ মার্চ তিনি কাজি অফিসে ৩৩ লাখ টাকা দেনমোহরে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সামছুল আলমকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর দ্বিতীয় স্বামী কর্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।
অভিযোগ রয়েছে, দ্বিতীয় স্বামী সামছুল আলম প্রবাসে থাকার সুযোগে ওই নারী পুনরায় নওগাঁ শহরের গোস্তহাটির মোড় এলাকায় বন্ধন টাওয়ারের তৃতীয় তলায় তার তালাকপ্রাপ্ত প্রথম স্বামী সান্টুর সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় চার বছর ধরে তারা একই ছাদের নিচে পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করে আসছেন। আইন ও ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী এ ধরনের সম্পর্ক অবৈধ। সম্প্রতি এমন ঘটনাটি আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেয়।
জানা গেছে, বগুড়ার সান্তাহারের পাশ্ববর্তী আত্রাই উপজেলার সাহাগোলা ইউনিয়নের কিতমত জাতপাড়া গ্রামের আয়েত আলী মন্ডলের মেয়ে মাহফুজা বেগম প্রায় দুই যুগ আগে একই জেলার রাণীনগর উপজেলার পারইল ইউনিয়নের বিলকৃষ্ণপুর গ্রামের আহাদ আলীর ছেলে সান্টু রহমানের সঙ্গে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দাম্পত্য জীবনে তাদের এক ছেলে সন্তান জন্ম নেয়। ছেলের লেখাপড়ার সুবিধার্থে মাহফুজা বেগম বগুড়া শহরে ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। সংসার চলাকালীন সময়ে ২০১৩ সালে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার রফিকুল হাসান জনির মাধ্যমে আমেরিকা প্রবাসী গাইবান্ধার ঝিলপাড়া গ্রামের মৃত আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে সামছুল আলমের সঙ্গে মাহফুজা বেগমের পরিচয় হয়। একপর্যায়ে বিভিন্ন কাজের সুবাদে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। পরে মোবাইল ফোনে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ১৪ মার্চ মাহফুজা বেগম তার প্রথম স্বামী সান্টু রহমানকে তালাক দেন এবং নওগাঁর একটি কাজি অফিসে ৩৩ লাখ টাকা দেনমোহরে আমেরিকা প্রবাসী সামছুল আলমকে বিয়ে করেন। বিয়ের পরপরই সামছুল আলম পুনরায় আমেরিকায় ফিরে যান। এরপর থেকে প্রবাসী স্বামীর কাছ থেকে নিয়মিত সংসার খরচের টাকা নিতে থাকেন মাহফুজা বেগম।
অভিযোগ রয়েছে, দ্বিতীয় স্বামী বিদেশে থাকার সুযোগে তালাকপ্রাপ্ত প্রথম স্বামী সান্টু রহমানের সঙ্গে গোপনে পুনরায় সংসার শুরু করেন মাহফুজা বেগম। তারা নওগাঁ শহরের গোস্তহাটির মোড় এলাকার বন্ধন টাওয়ারের একটি ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত চার বছর ধরে তারা একই ছাদের নিচে সংসার করে আসছেন। অন্যদিকে, প্রবাসী সামছুল আলম আমেরিকায় অবস্থানকালে তার প্রথম স্ত্রী রোকেয়া বেগমের কাছে দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি গোপন করে সংসার চালিয়ে আসছিলেন। তবে তার আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করলে স্ত্রী রোকেয়া বেগম ও সন্তানদের সন্দেহ সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে পারিবারিক চাপে সামছুল আলম স্বীকার করেন যে, তাকে দেশে নওগাঁর এক নারীর সঙ্গে ফাঁসিয়ে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি জানার পর ২০২১ সালে দেশে এসে প্রবাসী স্ত্রী রোকেয়া বেগম প্রতারণা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। মামলায় মাহফুজা বেগম, সান্টু রহমান, কুষ্টিয়ার মোহনপুর গ্রামের সেলিম রেজা, জনিসহ মোট ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার প্রেক্ষিতে জনিকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। মামলার বাদী রোকেয়া বেগম অভিযোগ করে বলেন, ২০১৩ সাল থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে তার স্বামীর কাছ থেকে প্রায় আড়াই কোটি টাকা নিয়েছেন মাহফুজা বেগম। এখনও প্রতি মাসে সংসার খরচ ও অন্যান্য খাতে নিয়মিত টাকা নিচ্ছেন তিনি। সেই টাকায় বর্তমানে তালাকপ্রাপ্ত প্রথম স্বামী সান্টু রহমানের সঙ্গে ঘর-সংসার করছেন বলে অভিযোগ করেন রোকেয়া বেগম।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই নারী মাহফুজা বেগম ও তার প্রাক্তন স্বামী সান্টু প্রায় দেড় বছর আগে শ্বাশুড়ির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গ্রামের বাড়িতে তারা একসঙ্গে যান। ওই সময় তাদের ঘনিষ্ঠভাবে একসাথে চলাফেরা করতে দেখে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক কানাঘুষার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে এলাকাবাসী কৌশলে তাদের ছবি ধারণ করেন। শুধু গ্রামেই নয়, শহরের বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরেই তাদের একসাথে দেখা যাচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। বিষয়টি ঘিরে প্রশ্নের মাত্রা আরও বাড়ে যখন অনুসন্ধানে উঠে আসে, মাহফুজা বেগম তার পাসপোর্টে পূর্বের স্বামীর নাম বাদ দিয়ে দ্বিতীয় স্বামী সেন্টুর নাম অন্তর্ভুক্ত করেন যার মূল উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকা যাত্রাকে সহজ করা। অভিযোগ রয়েছে, এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। প্রতারণার মাধ্যমে নিজের ছেলের নাতনীকে কন্যা হিসেবে দেখিয়ে জন্মসনদ তৈরি করা হয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে, প্রকৃতপক্ষে ওই কন্যা তার নাতনী এমনটাই বলছেন স্থানীয়রা। যাতে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাতে কোনো ধরনের আইনি জটিলতার মুখে পড়তে না হয়।
এ বিষয়ে বন্ধন টাওয়ারের এক কেয়ারটেকার জানান, গত চার বছর ধরে তিনি তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে সেন্টু ও মাহফুজা দম্পতিকে বসবাস করতে দেখছেন।
এ বিষয়ে মাহফুজা বেগম মুঠোফোনে কোন মন্তব্য করতে চাননা তিনি।
তালাকপ্রাপ্ত প্রথম স্বামী সান্টু রহমানের মন্তব্য জানতে চাইলে উল্টো নানান প্রশ্ন জুড়ে তিনি বলেন, আমি কি আপনাকে চিনি ? আমার ফোন নং কোথায় পেয়েছেন ? আমি কেন কথা বলব ? অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন- কে অভিযোগ করেছে তার নাম ঠিকানা দেন। তার কাছে কি আমার ফোন নং নাই তারে বলেন আমাকে ফোন দিতে। চেনা-জানা ছাড়া কারো কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননা তিনি।
জানতে চাইলে সকল বিষয় অস্বীকার করে প্রবাসে থাকা সামছুল আলম মুঠোফোনে বলেন, এগুলো মিথ্যা ও বানোয়াট। আমার সাবেক স্ত্রী এসব অপপ্রচার করছে। তবে মাহফুজার সাথে মাঝে মাঝে কথা হয়। আর আমার টাকা আমি যাকে খুশি তাকে দিবো।
রানীনগর উপজেলার পারইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহিদুর রহমান ২০২৩ সালে সান্টু ও মাহফুজার একটি বৈবাহিক সনদপত্র প্রদান করেন। তিনি জানান, তারা বর্তমানে একসাথেই ঘর-সংসার করে বসবাস করছেন। তাদের পরিচিত নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় ইউপি মেম্বারের স্বাক্ষর নেওয়া আছে প্রত্যয়নে। সান্টু ও মাহফুজ স্বামী-স্ত্রী। তারা এখনও স্বামী স্ত্রী হিসেবে গোস্তহাটির মোড়ে থাকছে। তবে তালাক ও দ্বিতীয় বিয়ের সম্পর্কে কিছু যানেন না তিনি।
আইনজীবী আতাউর রহমান জানায়, বিভিন্ন ধর্ম ও দেশের আইনে বহুবিবাহ নিয়ে স্পষ্ট বিধান রয়েছে। অধিকাংশ ধর্ম ও আইন অনুযায়ী একজন নারীর একাধিক স্বামী থাকা নিষিদ্ধ। ইসলামে পুরুষদের সর্বোচ্চ চারজন স্ত্রী রাখার অনুমতি থাকলেও নারীদের ক্ষেত্রে একাধিক স্বামী রাখা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। অন্যদিকে, হিন্দু বিবাহ আইন অনুযায়ী স্বামী বা স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিবাহ করা অবৈধ। এ ধরনের বিবাহ দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। আইন অনুযায়ী, অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হতে পারে।
নিউজ সোস: NCN

















