০৮:২৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বগুড়ার ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় কমিশন-বাণিজ্য, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামে সক্রিয় দালালচক্র

ডিবিএন প্রতিবেদক :
  • আপডেট সময় ০১:১৬:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লাস্টনিউজবিডি, ৬ সেপ্টেম্বর: সরকারি প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের পর ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বগুড়ার একাধিক জমির মালিক। তাদের দাবি, দ্রুত চেক পেতে ক্ষতিপূরণের টাকার ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত উৎকোচ দাবি করা হচ্ছে। এ কাজে ভূমি অধিগ্রহণ বা এলএ শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম ব্যবহার করে একটি দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

একটি জনপ্রিয় গণমাধ্যমের প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বগুড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখা ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের নেপথ্যে দালালচক্রের তৎপরতার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে একাধিক ভুক্তভোগীর বক্তব্যে ক্ষতিপূরণের টাকা ছাড়ে দীর্ঘসূত্রতা এবং অর্থ লেনদেনের একই ধরনের অভিযোগ উঠে এসেছে। তবে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম অভিযোগে এসেছে, তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

শেরপুর উপজেলার রামচন্দ্রপুর এলাকার শফিকুল ইসলামের ৩ শতক জমি একটি সরকারি প্রকল্পে অধিগ্রহণ হয়েছে। জমির সঙ্গে তার একটি টিনের স্থাপনাও রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা থাকলেও চার মাস ধরে চেকের জন্য এলএ শাখায় ঘুরছেন তিনি।

শফিকুলের অভিযোগ, এ সময় হাপুনিয়া এলাকার আলী হোসেন নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। প্রথমে নিজেকেও সেবাপ্রার্থী হিসেবে পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তি পরে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। শফিকুলের দাবি, ক্ষতিপূরণের টাকার ৩ শতাংশ অফিসারদের দিতে হবে এবং আলাদা করে তাকেও টাকা দিতে হবে বলে জানানো হয়। টাকা দিলে তিন থেকে চার দিনের মধ্যে চেক পাওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়।

শফিকুল আরও অভিযোগ করেন, টাকা দেওয়ার স্থান হিসেবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বাইরে সাতমাথা এলাকার কথা বলা হয়। সেখানে সিসি ক্যামেরার নজরদারি নেই বলেও তাকে জানানো হয়।

পরবর্তী সময়ে ভুক্তভোগী সেজে প্রতিবেদক মুঠোফোনে আলী হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে প্রায় একই ধরনের প্রস্তাব পাওয়া যায়। আলী হোসেন দাবি করেন, এলএ শাখার কর্মকর্তাদের ৩ শতাংশ দিতে হয়। এর বাইরে তাকে ১০ হাজার টাকা দিলে দ্রুত কাজ করে দিতে পারবেন। কোন কর্মকর্তার মাধ্যমে কাজ হবে জানতে চাইলে নির্দিষ্ট নাম না বলে একজন কানুনগোর সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আসমত আলী। তার ভাষ্য, একই এলাকায় জমি অধিগ্রহণ হওয়া এক ব্যক্তি দ্রুত ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়েছেন এবং পরে জানতে পারেন, এ জন্য তিনি টাকা দিয়েছেন। এরপর নিজের প্রায় ৯০ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণের চেক পেতেও দালালের মাধ্যমে ৩ শতাংশ হারে টাকা দিতে বাধ্য হন বলে অভিযোগ করেন আসমত। তার দাবি, টাকা দেওয়ার পরই ফাইলের অগ্রগতি দৃশ্যমানভাবে বেড়ে যায়।

নন্দীগ্রাম উপজেলার সামছুল আলমের ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময় আরও দীর্ঘ। একটি সেতু নির্মাণ প্রকল্পে তার ১৭ শতক জমি অধিগ্রহণ হয়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে ক্ষতিপূরণের জন্য চেষ্টা করছেন তিনি। চার থেকে পাঁচ মাস আগে তার জমির বিষয়ে ৮ ধারা জারি হলেও এখনো টাকা পাননি।

সামছুল আলমের দাবি, আশপাশের একজন জমির মালিক ৪ শতাংশ হারে টাকা দিয়ে ক্ষতিপূরণের অর্থ তুলেছেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন। নিজের ফাইল এগোচ্ছে না জানিয়ে তিনি আশঙ্কা করছেন, শেষ পর্যন্ত তাকেও টাকা দিতে হতে পারে। তার হিসাবে ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে প্রায় ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হতে পারে।

বগুড়া-সিরাজগঞ্জ-ঢাকা রেলপথ প্রকল্পে অধিগ্রহণ হওয়া জমির মালিকদের মধ্যেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বগুড়া সদর উপজেলার কৈচর দক্ষিণপাড়া এলাকার আমিনুল ইসলাম ও তার বাবা আলহাজ আব্দুল গফুর সরদারের ৬ দশমিক ৭৫ শতক জমি ওই প্রকল্পে অধিগ্রহণ হয়েছে। তাদের ক্ষতিপূরণের পরিমাণ প্রায় ১৪ লাখ টাকা।

আমিনুল ইসলামের অভিযোগ, দীর্ঘদিন অফিসে ঘোরার পর এলএ শাখার সার্ভেয়ার অসিম কুমারের সঙ্গে কাজ করে দেওয়ার বিষয়ে তার কথা হয়। ক্ষতিপূরণের ৩ শতাংশ হিসেবে ৪২ হাজার টাকা এবং অতিরিক্ত ৩ হাজার টাকা, সব মিলিয়ে ৪৫ হাজার টাকায় কাজ করে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয় বলে দাবি করেন তিনি। এর আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়া যাচ্ছে না বা কাগজ হারিয়ে গেছে বলে তাকে বারবার জানানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন আমিনুল।

একই রেল প্রকল্পে শাজাহানপুর উপজেলার চোপিনগরের বাদশা মিয়ার জমিও অধিগ্রহণ হয়েছে। গত ডিসেম্বর মাসে ৮ ধারা জারির পর থেকে ক্ষতিপূরণের জন্য চেষ্টা করছেন তিনি। অনুসন্ধানের সময় এলএ শাখায় ইসলামপুর হরিগাড়ী এলাকার মামুন নামের এক ব্যক্তিকে তার সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। নিজেকে ‘বিপদে পড়া মানুষের সহায়তাকারী’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তির প্রস্তাবও ছিল দ্রুত কাজ করে দেওয়ার। এর বিনিময়ে অফিসে ক্ষতিপূরণের ৩ শতাংশ এবং তাকে আলাদাভাবে টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়।
এই প্রতিবেদনের অনুসন্ধানে এলএ শাখার সার্ভেয়ার অসিম কুমার, অফিস সহকারী নূর ইসলাম এবং কানুনগো মাসুদ রানার নাম বিভিন্ন অভিযোগে এসেছে। তবে তিনজনই তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সার্ভেয়ার অসিম কুমার বলেন, ‘তিনি কাউকে হয়রানি করেন না। চাকরিজীবনে কখনো উৎকোচ নেননি এবং এমন কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতও নন। বাইরে কেউ তার নাম ব্যবহার করে থাকতে পারেন, কিন্তু তিনি এসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন।’

কানুনগো মাসুদ রানা বলেন, আলী হোসেন নামের ওই ব্যক্তিকে তিনি চেনেন না এবং অনুসন্ধানের দিনই তাকে প্রথম দেখেছেন। তার ভাষ্য, বাইরে কেউ কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম ব্যবহার করে টাকা দাবি করলেই তার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ হয় না। উৎকোচের কোনো ঘটনার সঙ্গেও তিনি জড়িত নন বলে দাবি করেন তিনি।

অফিস সহকারী নূর ইসলামও অভিযোগ নাকচ করে বলেন, মানুষ বিভিন্ন ধরনের কথা বলতে পারে। কেউ অভিযোগ করলেই সেটি সত্য হয়ে যায় না। কারও কাছে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলে লিখিতভাবে কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত। তার দাবি, এলএ শাখায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ আসেন, ফলে সবার উদ্দেশ্য যাচাই করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

এদিকে বিষয়টি জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমানের নজরে এলে তিনি এলএ শাখার সামনে অভিযান চালান। এ সময় দালাল হিসেবে অভিযুক্ত আলী হোসেনকে আটক করে পরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।

ক্ষতিপূরণের অর্থ না পাওয়ার আরেক অভিযোগ করেছেন শহরের সেউজগাড়ী এলাকার তানজিজুল ইসলাম স্মরণ। তার ৩ শতক জমি সরকারি প্রকল্পে অধিগ্রহণ হয়েছে। তার দাবি, সিএস রেকর্ড থেকে শুরু করে আদালতের রায়, সরকারি কৌঁসুলির ইতিবাচক মতামত, সহকারী কমিশনারের আদেশ, খাসমুক্তির কাগজ ও নতুন খতিয়ানসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র তিনি এলএ শাখায় জমা দিয়েছেন। এরপরও চার মাস ধরে ক্ষতিপূরণের টাকা পাচ্ছেন না।

তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জুবায়ের আরাবি বলেন, জমির মালিকানা নিয়ে সারিয়াকান্দি সহকারী জজ আদালতে মামলা হয়েছিল। পরে প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালতেও সরকারপক্ষ মামলাটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। দুই আদালতেই বাদীর পক্ষে রায় ও ডিক্রি বহাল থাকে। এরপর এলএ শাখা থেকে ক্ষতিপূরণের টাকা উত্তোলনের জন্য নোটিশ দেওয়া হলেও টাকা না দেওয়ার বিষয়টি আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বলে দাবি করেন তিনি।

ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা মুনিরা সুলতানা বলেন, আদালতের রায় থাকলেও বর্তমান সিএস বা আরএস রেকর্ডে জমিটি সরকারের নামে রয়েছে। রেকর্ড সংশোধন করে আনতে পারলে তানজিজুল ইসলাম ক্ষতিপূরণের টাকা পাবেন। তার মতে, সব ফাইলের পরিস্থিতি এক নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জমির মালিকানা ও রেকর্ড নিয়ে জটিলতা থাকায় আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ক্ষতিপূরণ দিতে হয়।

তানজিজুল ইসলাম স্মরণের প্রশ্ন, একই ধরনের জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে কেউ দ্রুত চেক পেলেও কেউ দীর্ঘদিন ফাইল নিয়ে ঘুরছেন কেন। প্রশাসনিক বা আইনি জটিলতার কারণে দেরি হলে সেবাপ্রার্থীদের তা স্পষ্টভাবে জানানো হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে দালালরা কীভাবে ক্ষতিপূরণের অংশ দাবি করার সাহস পাচ্ছেন, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।

সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে কাউকে ঘুষ বা পার্সেন্টেজ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এমন কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দালালচক্রের বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, কেউ কর্মকর্তা বা কর্মচারীর নাম ব্যবহার করে টাকা দাবি করলেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। দালালের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি কমাতে এলএ শাখায় পর্যাপ্ত জনবল দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকেও সেবাপ্রার্থীদের কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়ায় কোনো অনৈতিক লেনদেনে না জড়িয়ে সরাসরি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।

সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযানের (সুপ্র) সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, অভিযোগগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিভিন্ন প্রকল্পের একাধিক ভুক্তভোগীর বক্তব্যে একই ধরনের অভিযোগ এসেছে। কেউ ৩ শতাংশ, কেউ ৪ শতাংশ আবার কেউ ৫ শতাংশ পর্যন্ত টাকা চাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

তার মতে, প্রশাসন যদি ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়ার সুযোগ থাকার কথা বলে, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে সেবাপ্রার্থীরা কেন দালালের কাছে যাচ্ছেন, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই প্রকল্পে একজনের কাজ দ্রুত শেষ হলেও অন্যের ফাইল মাসের পর মাস আটকে থাকার কারণের স্বচ্ছ ব্যাখ্যাও থাকা দরকার।

কেজিএম ফারুক আরও বলেন, দালালরা প্রকাশ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম ব্যবহার করে টাকা দাবি করলে তাদের সঙ্গে অফিসের কারও যোগাযোগ আছে কি না এবং দীর্ঘদিন ধরে অফিস চত্বরে তাদের তৎপরতা চললেও কার্যকর নজরদারি কেন নিশ্চিত করা যায়নি, তা খতিয়ে দেখা উচিত।

শুধু দালাল আটক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না বলেও মনে করেন তিনি। তার মতে, মানুষ কেন দালালের কাছে যেতে বাধ্য হচ্ছে, সেই ব্যবস্থাগত দুর্বলতাগুলোও চিহ্নিত করা প্রয়োজন। কোন ফাইল কত দিন ধরে আটকে আছে, কী কারণে আটকে আছে এবং কখন তা নিষ্পত্তি হওয়ার কথা, এসব তথ্য সেবাপ্রার্থীদের জন্য সহজলভ্য করা গেলে দালালদের তৎপরতার সুযোগ কমে আসবে।

কাটেসি: লাস্ট নিউজ বিডি

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

বগুড়ার ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় কমিশন-বাণিজ্য, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামে সক্রিয় দালালচক্র

আপডেট সময় ০১:১৬:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লাস্টনিউজবিডি, ৬ সেপ্টেম্বর: সরকারি প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের পর ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বগুড়ার একাধিক জমির মালিক। তাদের দাবি, দ্রুত চেক পেতে ক্ষতিপূরণের টাকার ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত উৎকোচ দাবি করা হচ্ছে। এ কাজে ভূমি অধিগ্রহণ বা এলএ শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম ব্যবহার করে একটি দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

একটি জনপ্রিয় গণমাধ্যমের প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বগুড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখা ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের নেপথ্যে দালালচক্রের তৎপরতার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে একাধিক ভুক্তভোগীর বক্তব্যে ক্ষতিপূরণের টাকা ছাড়ে দীর্ঘসূত্রতা এবং অর্থ লেনদেনের একই ধরনের অভিযোগ উঠে এসেছে। তবে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম অভিযোগে এসেছে, তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

শেরপুর উপজেলার রামচন্দ্রপুর এলাকার শফিকুল ইসলামের ৩ শতক জমি একটি সরকারি প্রকল্পে অধিগ্রহণ হয়েছে। জমির সঙ্গে তার একটি টিনের স্থাপনাও রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা থাকলেও চার মাস ধরে চেকের জন্য এলএ শাখায় ঘুরছেন তিনি।

শফিকুলের অভিযোগ, এ সময় হাপুনিয়া এলাকার আলী হোসেন নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। প্রথমে নিজেকেও সেবাপ্রার্থী হিসেবে পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তি পরে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। শফিকুলের দাবি, ক্ষতিপূরণের টাকার ৩ শতাংশ অফিসারদের দিতে হবে এবং আলাদা করে তাকেও টাকা দিতে হবে বলে জানানো হয়। টাকা দিলে তিন থেকে চার দিনের মধ্যে চেক পাওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়।

শফিকুল আরও অভিযোগ করেন, টাকা দেওয়ার স্থান হিসেবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বাইরে সাতমাথা এলাকার কথা বলা হয়। সেখানে সিসি ক্যামেরার নজরদারি নেই বলেও তাকে জানানো হয়।

পরবর্তী সময়ে ভুক্তভোগী সেজে প্রতিবেদক মুঠোফোনে আলী হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে প্রায় একই ধরনের প্রস্তাব পাওয়া যায়। আলী হোসেন দাবি করেন, এলএ শাখার কর্মকর্তাদের ৩ শতাংশ দিতে হয়। এর বাইরে তাকে ১০ হাজার টাকা দিলে দ্রুত কাজ করে দিতে পারবেন। কোন কর্মকর্তার মাধ্যমে কাজ হবে জানতে চাইলে নির্দিষ্ট নাম না বলে একজন কানুনগোর সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আসমত আলী। তার ভাষ্য, একই এলাকায় জমি অধিগ্রহণ হওয়া এক ব্যক্তি দ্রুত ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়েছেন এবং পরে জানতে পারেন, এ জন্য তিনি টাকা দিয়েছেন। এরপর নিজের প্রায় ৯০ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণের চেক পেতেও দালালের মাধ্যমে ৩ শতাংশ হারে টাকা দিতে বাধ্য হন বলে অভিযোগ করেন আসমত। তার দাবি, টাকা দেওয়ার পরই ফাইলের অগ্রগতি দৃশ্যমানভাবে বেড়ে যায়।

নন্দীগ্রাম উপজেলার সামছুল আলমের ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময় আরও দীর্ঘ। একটি সেতু নির্মাণ প্রকল্পে তার ১৭ শতক জমি অধিগ্রহণ হয়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে ক্ষতিপূরণের জন্য চেষ্টা করছেন তিনি। চার থেকে পাঁচ মাস আগে তার জমির বিষয়ে ৮ ধারা জারি হলেও এখনো টাকা পাননি।

সামছুল আলমের দাবি, আশপাশের একজন জমির মালিক ৪ শতাংশ হারে টাকা দিয়ে ক্ষতিপূরণের অর্থ তুলেছেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন। নিজের ফাইল এগোচ্ছে না জানিয়ে তিনি আশঙ্কা করছেন, শেষ পর্যন্ত তাকেও টাকা দিতে হতে পারে। তার হিসাবে ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে প্রায় ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হতে পারে।

বগুড়া-সিরাজগঞ্জ-ঢাকা রেলপথ প্রকল্পে অধিগ্রহণ হওয়া জমির মালিকদের মধ্যেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বগুড়া সদর উপজেলার কৈচর দক্ষিণপাড়া এলাকার আমিনুল ইসলাম ও তার বাবা আলহাজ আব্দুল গফুর সরদারের ৬ দশমিক ৭৫ শতক জমি ওই প্রকল্পে অধিগ্রহণ হয়েছে। তাদের ক্ষতিপূরণের পরিমাণ প্রায় ১৪ লাখ টাকা।

আমিনুল ইসলামের অভিযোগ, দীর্ঘদিন অফিসে ঘোরার পর এলএ শাখার সার্ভেয়ার অসিম কুমারের সঙ্গে কাজ করে দেওয়ার বিষয়ে তার কথা হয়। ক্ষতিপূরণের ৩ শতাংশ হিসেবে ৪২ হাজার টাকা এবং অতিরিক্ত ৩ হাজার টাকা, সব মিলিয়ে ৪৫ হাজার টাকায় কাজ করে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয় বলে দাবি করেন তিনি। এর আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়া যাচ্ছে না বা কাগজ হারিয়ে গেছে বলে তাকে বারবার জানানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন আমিনুল।

একই রেল প্রকল্পে শাজাহানপুর উপজেলার চোপিনগরের বাদশা মিয়ার জমিও অধিগ্রহণ হয়েছে। গত ডিসেম্বর মাসে ৮ ধারা জারির পর থেকে ক্ষতিপূরণের জন্য চেষ্টা করছেন তিনি। অনুসন্ধানের সময় এলএ শাখায় ইসলামপুর হরিগাড়ী এলাকার মামুন নামের এক ব্যক্তিকে তার সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। নিজেকে ‘বিপদে পড়া মানুষের সহায়তাকারী’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তির প্রস্তাবও ছিল দ্রুত কাজ করে দেওয়ার। এর বিনিময়ে অফিসে ক্ষতিপূরণের ৩ শতাংশ এবং তাকে আলাদাভাবে টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়।
এই প্রতিবেদনের অনুসন্ধানে এলএ শাখার সার্ভেয়ার অসিম কুমার, অফিস সহকারী নূর ইসলাম এবং কানুনগো মাসুদ রানার নাম বিভিন্ন অভিযোগে এসেছে। তবে তিনজনই তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সার্ভেয়ার অসিম কুমার বলেন, ‘তিনি কাউকে হয়রানি করেন না। চাকরিজীবনে কখনো উৎকোচ নেননি এবং এমন কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতও নন। বাইরে কেউ তার নাম ব্যবহার করে থাকতে পারেন, কিন্তু তিনি এসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন।’

কানুনগো মাসুদ রানা বলেন, আলী হোসেন নামের ওই ব্যক্তিকে তিনি চেনেন না এবং অনুসন্ধানের দিনই তাকে প্রথম দেখেছেন। তার ভাষ্য, বাইরে কেউ কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম ব্যবহার করে টাকা দাবি করলেই তার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ হয় না। উৎকোচের কোনো ঘটনার সঙ্গেও তিনি জড়িত নন বলে দাবি করেন তিনি।

অফিস সহকারী নূর ইসলামও অভিযোগ নাকচ করে বলেন, মানুষ বিভিন্ন ধরনের কথা বলতে পারে। কেউ অভিযোগ করলেই সেটি সত্য হয়ে যায় না। কারও কাছে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলে লিখিতভাবে কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত। তার দাবি, এলএ শাখায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ আসেন, ফলে সবার উদ্দেশ্য যাচাই করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

এদিকে বিষয়টি জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমানের নজরে এলে তিনি এলএ শাখার সামনে অভিযান চালান। এ সময় দালাল হিসেবে অভিযুক্ত আলী হোসেনকে আটক করে পরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।

ক্ষতিপূরণের অর্থ না পাওয়ার আরেক অভিযোগ করেছেন শহরের সেউজগাড়ী এলাকার তানজিজুল ইসলাম স্মরণ। তার ৩ শতক জমি সরকারি প্রকল্পে অধিগ্রহণ হয়েছে। তার দাবি, সিএস রেকর্ড থেকে শুরু করে আদালতের রায়, সরকারি কৌঁসুলির ইতিবাচক মতামত, সহকারী কমিশনারের আদেশ, খাসমুক্তির কাগজ ও নতুন খতিয়ানসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র তিনি এলএ শাখায় জমা দিয়েছেন। এরপরও চার মাস ধরে ক্ষতিপূরণের টাকা পাচ্ছেন না।

তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জুবায়ের আরাবি বলেন, জমির মালিকানা নিয়ে সারিয়াকান্দি সহকারী জজ আদালতে মামলা হয়েছিল। পরে প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালতেও সরকারপক্ষ মামলাটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। দুই আদালতেই বাদীর পক্ষে রায় ও ডিক্রি বহাল থাকে। এরপর এলএ শাখা থেকে ক্ষতিপূরণের টাকা উত্তোলনের জন্য নোটিশ দেওয়া হলেও টাকা না দেওয়ার বিষয়টি আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বলে দাবি করেন তিনি।

ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা মুনিরা সুলতানা বলেন, আদালতের রায় থাকলেও বর্তমান সিএস বা আরএস রেকর্ডে জমিটি সরকারের নামে রয়েছে। রেকর্ড সংশোধন করে আনতে পারলে তানজিজুল ইসলাম ক্ষতিপূরণের টাকা পাবেন। তার মতে, সব ফাইলের পরিস্থিতি এক নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জমির মালিকানা ও রেকর্ড নিয়ে জটিলতা থাকায় আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ক্ষতিপূরণ দিতে হয়।

তানজিজুল ইসলাম স্মরণের প্রশ্ন, একই ধরনের জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে কেউ দ্রুত চেক পেলেও কেউ দীর্ঘদিন ফাইল নিয়ে ঘুরছেন কেন। প্রশাসনিক বা আইনি জটিলতার কারণে দেরি হলে সেবাপ্রার্থীদের তা স্পষ্টভাবে জানানো হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে দালালরা কীভাবে ক্ষতিপূরণের অংশ দাবি করার সাহস পাচ্ছেন, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।

সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে কাউকে ঘুষ বা পার্সেন্টেজ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এমন কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দালালচক্রের বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, কেউ কর্মকর্তা বা কর্মচারীর নাম ব্যবহার করে টাকা দাবি করলেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। দালালের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি কমাতে এলএ শাখায় পর্যাপ্ত জনবল দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকেও সেবাপ্রার্থীদের কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়ায় কোনো অনৈতিক লেনদেনে না জড়িয়ে সরাসরি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।

সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযানের (সুপ্র) সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, অভিযোগগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিভিন্ন প্রকল্পের একাধিক ভুক্তভোগীর বক্তব্যে একই ধরনের অভিযোগ এসেছে। কেউ ৩ শতাংশ, কেউ ৪ শতাংশ আবার কেউ ৫ শতাংশ পর্যন্ত টাকা চাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

তার মতে, প্রশাসন যদি ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়ার সুযোগ থাকার কথা বলে, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে সেবাপ্রার্থীরা কেন দালালের কাছে যাচ্ছেন, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই প্রকল্পে একজনের কাজ দ্রুত শেষ হলেও অন্যের ফাইল মাসের পর মাস আটকে থাকার কারণের স্বচ্ছ ব্যাখ্যাও থাকা দরকার।

কেজিএম ফারুক আরও বলেন, দালালরা প্রকাশ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম ব্যবহার করে টাকা দাবি করলে তাদের সঙ্গে অফিসের কারও যোগাযোগ আছে কি না এবং দীর্ঘদিন ধরে অফিস চত্বরে তাদের তৎপরতা চললেও কার্যকর নজরদারি কেন নিশ্চিত করা যায়নি, তা খতিয়ে দেখা উচিত।

শুধু দালাল আটক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না বলেও মনে করেন তিনি। তার মতে, মানুষ কেন দালালের কাছে যেতে বাধ্য হচ্ছে, সেই ব্যবস্থাগত দুর্বলতাগুলোও চিহ্নিত করা প্রয়োজন। কোন ফাইল কত দিন ধরে আটকে আছে, কী কারণে আটকে আছে এবং কখন তা নিষ্পত্তি হওয়ার কথা, এসব তথ্য সেবাপ্রার্থীদের জন্য সহজলভ্য করা গেলে দালালদের তৎপরতার সুযোগ কমে আসবে।

কাটেসি: লাস্ট নিউজ বিডি